নাসরীন জাহানের গল্প ‘যে অন্ধ লোকটি রঙ দেখতে জানতো’ নাট্যরুপঃ সৈয়দ মোশারফ

Written By HBNtv.com on রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১২ | ৩:১৩ AM

দৃশ্যঃ ১
সময়ঃ দিন
রাস্তা

রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে অন্ধ লোকটি, হাতে সাদা ছড়ি। ঠুকঠুক শব্দ তুলে মৃদু লয়ে হেটে যাচ্ছে অন্ধ, মুখে চিরচেনা সেই ছোট্ট হাসি। যা লেপটে থাকে সব সময় সুন্দর মুখটিতে।

রাস্তার উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসে জোসনা। নার্সের সাদা পোষাক, মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন সাদায় হাসছে। অন্ধকে দেখে একটু থামে, গভীরভাবে দেখে, পাশ কেটে চলে যায় সাবধানে। একটু দুরে গিয়ে ফিরে তাকায়। দেখতে পায় অন্ধটি হাঁটা বন্ধ করে ফিরে তাকায়। যেন তাকে দেখছে গভীর ভালোবাসায়। মুখে মিষ্টি হাসি ঝিলিক খেলে চলেছে। লজ্জা অবনত তখন নার্সটির চোখে মুখে দ্বিধাদ্বন্ধের খেলা চলে। কিন্তু যেতে পারেনা। সেও দেখে অন্ধ লোকটিকে তখন মনে মনে অন্ধ বলেছে।

অন্ধ    :    “বাহ্ বাহারের সাদারে! সাদার ভিতরে সাদায় যেন উথাল পাথাল ঢেউ এর খেলা খেলে চলেছে। কোন কষ্ট কি এত সাদার ভিতরে কাদা লেপটে দিতে পারে? সুখ যেন গিলে খায় গো সাদা পোষাকের মনের মানুষটিকে। এই প্রার্থনা আজ আমার অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে।”
(হাসতে হাসতে পথ চলে আবার নিজের মত। নার্সটি দেখে, অন্ধ লোকটি আবার ঠুকঠুক করতে করতে চলে যাচ্ছে।)

কাট-

দৃশ্য : ২

সময় : দিন
রাস্তা
পাশে চিঠি বিছিয়ে বসে আছে মতলব। একটি টিয়ে পাখি হাঁটে চিঠির খামের উপর দিয়ে। গভীরভাবে দেখছে এক ভদ্রলোক, হাতে পাঁচ টাকার একটি নোট। ভদ্রলোকটিকে দেখছে মতলব, যেন মেপে নিচ্ছে আগা পাঁচ তালা। টিয়া পাখিটি একটি চিঠি তুলে নেয় মুখে। হাতে নেয় মতলব, হাসি মাখা মুখে খুলে। ঠিক তখনই ঠুকঠুক করতে করতে এসে হাজির হয় অন্ধ লোকটি।

ভদ্রলোক   :    কি লেখা ভাই?
মতলব    :    সৌভাগ্যবান। ইচ্ছে করলে চাঁন্দের দেশে যেতে পারেন। ইচ্ছা হইলো শক্তি
ভদ্রলোক   :    শুধু এই টুকু?
মতলব    :    অল্পে কইলে মর্দে বুঝে, ব্যাকটুক কহিলে মাইয়া পুলাও বুঝে না
ভদ্রলোক   :    মাইয়া পোলা গো এতো অবজ্ঞা অবহেলা কইরা কথা কয়েন না, মাইয়া পোলা যা পারে-

মতলব    :    হ’রে ভাই বুঝছি- আপনার ইচ্ছাই শক্তি, ইচ্ছা করেন রাজা হবেন। কেউ ঠেকাইতে পারবো না।

ভদ্রলোক   :    তাই নাকি?
মতলব   :    রাজ প্রাসাদ চান? হবে, রাজকন্যা চান? হবে। সৌভাগ্যবান আপনি যেই তেই কথা, ইচ্ছা শক্তির উপরেই আপনার ঐশ্বর্য।
ভদ্রলোক   :    চাপাবাজি করবার জাগা পান না; না?
মতলব    :    চাপা বাজি !!
ভদ্রলোক   :   আইজ পাঁচ সাত বছর একটা চাকরির জন্যে সেন্ডেল তো সেন্ডেল পায়ের চামরায় কড়া ফেলাইয়া দিলাম, মনে করছিলাম বাপের জায়গা জমি বেইচা ভালো ব্যাবসায়ী হবো। লাল বাত্তি জ্বলাইয়া দিছি। ইচ্ছা শক্তি? রাজা? রাজকন্যা? বউরে এতো ভালোবাসা দিছি, ভাইগা গেছে আর একজনের হাত ধইরা, সৌভাগ্যবান? চান্দের দেশে? (উঠে দাঁড়ায় লোকটি)

মতলব    :   টেকা? টেকা দিবেন না?
ভদ্রলোক    :    আবার টেকা? চাপাবাজি বন্ধ না করলে চাপার দাঁত ভাইঙ্গা হাতে তুইলা দিমু।
(পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধলোকটির হাতে পাঁচ টাকা দিয়ে চলে যায়।)

মতলব    ঃ    ওই ব্যাটা ভাগ এই খান থিকা!
অন্ধ    ঃ    কী ক্ষতি করেছি ভাই?
মতলব    ঃ    দাদা গো দ্যাশ থিকা আইছো? কী ভাষা! কে হিখাইছে?
অন্ধ    ঃ    কি ক্ষতি করেছি ভাই?
মতলব    ঃ    আরে-- বা-! এ দেখি পোষা ময়না, জীবনের কত অভিজ্ঞতা। সব বিফলে গেল!
অন্ধ    ঃ    কিসের অভিজ্ঞতা?
মতলব    ঃ    সিদ কাটা থিকা শুরু কইরা, মরা মানুষের লাশ দেখাইয়া মাইনষের দয়া দাক্ষিনে সুনিপুন দক্ষতায় পকেট কাটা- আর তুমি- বেটা হুতুম প্যাঁচার মতো চেহারা নিয়া-

অন্ধ    ঃ    কি করবো ভাই, কোন গুন নেই, ছেলে বেলাতেই চোখে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছুদিন মা দেখেছে। বাপটা মরে যাবার পর মা ও যে চলে গেল সুখের সন্ধানে। সুখের নাগর আমাকে সহ্য করবে কেন? কে আমি?

মতলব    ঃ    বাহ্ রে বা- ভালোই তো চাপাবাজি জানো দেখতেছি, তারপর?
অন্ধ    ঃ    তার পর কি, ঠোক্কর খেতে খেতে এখন দেখি নিজেকে পাক্কা ভিক্ষুক হিসাবে...
মতলব    ঃ    ওই ব্যাটা চাপাবাজি বন্ধ কর।
অন্ধ    ঃ    এই দারিদ্রতাকে আমি ঘৃনা করি। ভিক্ষা বৃত্তিকেও- ( এবার সত্যি রেগে যায় মতলব )
মতলব    ঃ    কাইল থিকা যেন এইখানে আর না দেখি। দেখলে খবর- আছে!
কাট-

দৃশ্য ঃ ৩
সময় ঃ রাত
বটগাছ

(একটি বটগাছের কাছে এগিয়ে যায় অন্ধলোকটি। হাতের লাঠিতে ঠুকঠুক করে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তার পর সুরহীন শব্দ করে বলতে থাকে।)

অন্ধ    ঃ আহা-রে বাহারে কি দিন ছিল-
  মায়ের রঙ কালো ছিল,
  চাঁদের রঙ হলুদ ছিল
  ভাতের রঙ সাদা ছিল।

(একটি ছোট্ট মেয়ে সামনে ধাম করে বসে, হাসে, সবটাই কল্পনা।)

মেয়ে    ঃ আমার রঙ কেমন ছিল?

অন্ধ    ঃ সুন্দর ছিল।

মেয়ে    ঃ না এখনও সুন্দর আছে। ( হাসে অন্ধ লোকটি, পরিতৃপ্তির হাসি ) আচ্ছা তোমার ঘুম আসেনা?

অন্ধ    ঃ ঘুমালেও যা শুয়ে থাকলেও তা, তাইতো শুয়ে শুয়ে বাতাসের রঙ দেখি, তারাদের রঙ দেখি। রাত্রির অন্ধকারে সব বৃক্ষডুবে গেলে যা ধারণ করে; তার রঙ দেখি।

মেয়ে    ঃ কিভাবে দেখো? তোমার তো দৃষ্টি শক্তি নেই!

অন্ধ    ঃ অন্তর দিয়ে দেখি, অন্তরের অন্তস্থল দিয়ে দেখি, কি বাহারের দিন ছিল, মায়ের রঙ কালো ছিল, তোমার রঙ ভালো ছিল।

মেয়ে    ঃ না না এখনও ভালো আছে।

অন্ধ    ঃ ভালোর সবটাই ভালো। তুমি যে খুব ভালো গো মেয়ে; সত্যি ভালো। আমার মতো। তাই তো প্রতিদিন কল্পনায় তুমি আমার সাথেই থাকো। আচ্ছা তুমি কি আমি?
(সুপার ইম্পোজে আবার মেয়েটি মিলিয়ে যায় হাসতে হাসতে। হাসে অন্ধ লোকটিও )
চাঁদের রঙ হলুদ ছিল
ভাতের রঙ সাদা ছিল।

মিক্স টু

দৃশ্য ঃ ৪
সময় ঃ দিন
রাস্তা

বসে আছে মতলব মিয়া পশরা সাজিয়ে। এক দিক থেকে কথা শোনা যায় অন্ধ লোকটির। অন্ধ লোকটির কথা ওভার ল্যাপ হয় মতলবের উপর।
‘চাঁদের রঙ হলুদ ছিল, ভাতের রঙ সাদা ছিল’,
(সাদা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে প্রবেশ করে অন্ধ লোকটি)

অন্ধ    ঃ    রাত যায়, দিন যায়, নাগরিক আকাশ ছিঁড়ে পাখি চলে যায়। আমিও একদিন চলে যাবো।
মতলব    ঃ    আর গেছোস ব্যাটা, তুই গেলে আমারে জ্বালাইবো কেডা?
অন্ধ    ঃ    খুব ছোট বেলায়, এখনও মনে আছে আমার। বিভিন্ন রঙের প্রতি আমার ছিল দূর্মর কৌতুহল। গাছের পাতাটি সবুজ না হয়ে যদি নীল হতো; কেমন হতো?

মতলব    ঃ    ঘুড়ার আন্ডা হইতো।
অন্ধ    ঃ    (যেন কথাটি শুনতে পাইনি অন্ধলোকটি। সে তার মতো বলে চলে) কিংবা আকাশ যদি থাকতো সারাক্ষন বেগুনী! তেমনি এখন মনে হচ্ছে, আমার প্রতি যদি তোমার রাগ না থেকে থাকতো যদি ভালোবাসা; কেমন হতো?

মতলব    ঃ    ওরে সর্বনাশ!!! দেখছো নাকি চাপাবাজি, রংবাজরে এ্যাঁ!!! আমার তো মনে হইতেছে আমার নাম মতলব না হইয়া তোমার হইলে কেমন হইতো?

অন্ধ    ঃ    এতোদিন এক সাথে আছি, আজই আপনার নাম প্রথম জানলাম। মতলব।
মতলব    ঃ    চাপাবাজিতে উস্তাদ লোক আমি, ট্রেনিংপ্রাপ্ত। পুলিশের প্যাদানি খাইছি কতবার, পাবলিকের ঠ্যাংঙ্গানি খাইছি কতশত স্ট্যাইলে, কমিশনারের চামগিরি কইরা চাপাবাজির রাজনীতি শিখছি। কেমনে ল্যাং মারতে হয়, ফাউল কইরাও গোল করতে হয়- প্রতিপক্ষরে ঘায়েল করতে হয়, সব মন্ত্র আমার জানা।

অন্ধ    ঃ    অনেক অভিজ্ঞতা আপনার।
মতলব    ঃ    নিজের ভাগ্যে বাঁশ দিয়া, কাকতাড়–য়ার মতো বইসা বইসা মানুষের ভাগ্য নিয়া খেলা করি, শান্ত নিরিবিলি।

অন্ধ    ঃ    বাহ; ভালো, খুব ভালো।
মতলব    ঃ    ভালোর খেতাপুড়ি, নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চাই। ঝুট-ঝামেলা সহ্য করবোনা, এই আমি বইলা দিলাম -হ্যাঁ।

(একটি বাচ্চা মেয়ে সহ একটি লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল হাতে কালো একটি পান্ডা। বাচ্চা মেয়েটি টিয়া পাখি দেখে থেমে যায়, ওদের কথাবার্তাও থেমে যায়।)

প্রত্যাশা    ঃ    মামা, কি সুন্দর টিয়া পাখি! (মতলবকে বলে) আচ্ছা পোষমানা না? উড়ছে না দেখেছো মামা। (হাসি ফুটে উঠে মতলবের মুখে )

মামা    ঃ    প্রত্যাশা, ভাগ্য পরীক্ষা করে এই টিয়া।
প্রত্যাশা    ঃ    আমি আমার ভাগ্য পরীক্ষা করবো মামা।
মামা    ঃ    এই কত লাগবে পরীক্ষা করতে?
মতলব    ঃ    দরদাম নাই। খুশি মনে যা উঠে হাতে। ওই ব্যাটা ভিখারীর মতো ভিক্ষা করিনা।
মামা    ঃ    দেখি লাগাও তোমার ভেলকি।
মতলব    ঃ    লাগ ভেলকি লাগ চোখে মুখে লাগ।

(বলে টিয়া পাখিটি ছেড়ে দেয় চিঠির উপরে। টিয়া পাখি হাঁটতে থাকে, গভীরভাবে দেখে প্রত্যাশা। হাতের পুতুলটি পাশে দাঁড়ানো অন্ধ লোকটির হাতে দিয়ে বসে পড়ে। পুতুলটি নেড়েচেড়ে দেখে অন্ধলোকটি, টিয়া একটি চিঠি তুলে। হাতে নেয় মতলব। চিঠি খুলে, মুখটা কালো হয়ে যায় মতলবের)

প্রত্যাশা    ঃ    কি হলো ভাগ্যের?
মতলব    ঃ    কিছুই হয় নাই, হবে- তারই ইঙ্গিত।
মামা    ঃ    কিশের ইঙ্গিত?
মতলব    ঃ    কেতুর প্রভাবে ডুব সাঁতার। সামনেই শনি। অন্ধকার! ঘোরতর অন্ধকার!
প্রত্যাশা    ঃ    কি হবে মামা?
মতলব    ঃ    ব্যবস্থা আছে। ভয়ের কিছু নাই লক্ষ্মিসোনা।
অন্ধ    ঃ    পুতুল কখনও এতো কালো হয়? (মতলব রেগে টং হয়ে যায় অন্ধের কথায়, ব্যবসার ছলচাতুরীর সবেমাত্র শুরু করেছিল সে)

প্রত্যাশা    ঃ    কালোও ভালো; ভালোও ভালো।
মতলব    ঃ    বেটা অন্ধ। পুতুল যে কালো তুই বুঝলি কেমনে? দেখছেন ভাই ছলচাতুরী! বেটা অন্ধ সাইজা ভিক্ষা করে!!!

প্রত্যাশা    ঃ    অন্ধ!! কোথায় অন্ধ!!! ওতো তাকিয়ে আছে।
মামা    ঃ    এই, সত্যি সত্যি চোখে দেখো নাকি তুমি? (কোন কথা বলে না চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকে লোকজন জমে যায় দু’একজন করে। গতকালের ভদ্রলোকটিও এসে দাঁড়ায়।)

মতলব    ঃ    ভন্ড। তাইতো কই লোকজন ছাড়া চলে কেমনে? অন্ধ? জালিয়াত, জোচ্চোর। খচ্চর একটা, ফোরটুয়েন্টি।

ভদ্রলোক    ঃ    কাইল নগদে পাঁচ টাকা ভিক্ষা দিছি। শালা। ধাপ্পাবাজ, ধড়িবাজ, ধোকাবাজ।

(বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। লোকজনের সঙ্গে মতলবও। সবাই মিলে মারতে থাকে। অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে প্রত্যাশা মানুষের নিষ্ঠুরতা।)
দৃশ্য ঃ ৫
সময় ঃ দিন
রাস্তা

নার্স মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেটে আসতে আসতে থেমে যায় সেই নির্ধারিত জায়গায়। সামনে পিছনে দেখে ভালো করে।

নার্স    ঃ    আশ্চর্য প্রতিদিন সকালে ঠিক এই জায়গাটায় সেই অন্ধ লোকটির সাথে দেখা হয়। আজ দু’দিন ধরে কোথায় গেল মানুষটা? অসুখ বিসুখ করেনি তো ?
(মনে মনে যেন নিজেকেই নিজে বলে) “বিনে সূতায় এতো টান কেন মানুষটার প্রতি? অন্ধ ফকির, তার জন্যে কিশের এতো ভালোবাসা?
(আবার চার পাশটা দেখে অবশেষে পথ চলে)


দৃশ্য ঃ ৬
সময় ঃ রাত
বটগাছ তলা
এক পাশে একটি মাটির হাঁড়িতে ভাত ফুটছে, ধুঁয়া উড়ছে। বাঁধানো বটগাছের গোড়ায় শুয়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে অন্ধ লোকটি। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসে যেন কল্পনার সেই মেয়েটি।

মেয়েটি    ঃ    ভাত ফুটে গেছে তো?
অন্ধ    ঃ    থাক। ফুটতে ফুটতে পানি হয়ে যাক। তারপর ফুরুত করে খেয়ে ফেলবো।
মেয়েটি    ঃ    আমার তো মনে হচ্ছে তাও পারবে না, তোমার সমস্ত শরীর ব্যাথা হয়ে আছে। মুখটাও।
অন্ধ    ঃ    ওরা আমার সমস্ত শরীরে মেরেছে জানো?
মেয়েটি    ঃ    জানবো না কেন? আমি তো তোমার সঙ্গেই থাকি। তোমার কল্পনায় হাটি, তোমার কল্পনায় কথা বলি- আচ্ছা তুমি কোন কথা বললে না কেন?

অন্ধ    ঃ    কি বলবো?
মেয়েটি    ঃ    তাইতো! কি বলবে-?
দৃশ্য ৭
সময় ঃ দিন
রাস্তা
বটগাছের দিকে এগিয়ে আসছে মতলব। মাথায় লাল টুপি, বিচিত্র বর্ণের জামা। মনে মনে বলে-

মতলব    ঃ    “আইজকা ওরে এলাকা ছাড়া করমু, শালা। ঘাপটি বাজ”।

কাট-

দৃশ্য ঃ ৮
সময় ঃ রাত
বটতলা
ভাত ফুটছেই। শুয়ে আছে অন্ধ লোকটি। হঠাৎ সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে প্রত্যাশা।

প্রত্যাশা    ঃ    জানো তুমি যে অন্ধ, কেউ বিশ্বাস না করলেও আমি করেছিলাম কিন্তু-
অন্ধ    ঃ    আমি জানি তো? কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আমার সেই মেয়েটি কোথায় গেলো-

প্রত্যাশা    ঃ    কোন মেয়েটি?
অন্ধ    ঃ    আগে খুব ভালো ছিল, মায়ের রঙ কালো ছিল (প্রত্যাশা মিলিয়ে যায় ভাতের ধোয়ার সঙ্গে) মা, মা, ও মা, সমস্ত শরীরে ব্যথা গো মা-
(চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্র“ধারা অন্ধ লোকটির। ব্যাথা মাখা কন্ঠে বলতে থাকে )
‘মায়ের রঙ কলো ছিল, চাঁদের রঙ হলুদ ছিল, ভাতের রঙ সাদা ছিল’ (এসে দাঁড়ায় মতলব মাথার দিকে একটু দূরে) আগে খুব ভালো ছিল। এই মেয়ে কোথায় -মেয়ে কোথায় গেলে তুমি?
(ভয় পায় মতলব। চার পাশটা দেখে ) ও বুঝতে পেরেছি, মানুষ দেখে ভয় পেয়েছো। ভয়ংকার মানুষ হলেও মানুষ তো। (মতলব কোন রকমে বলে- )

মতলব    ঃ    ওই ব্যাটা ওই, কার সাথে কথা কস?
অন্ধ    ঃ    নিজের সঙ্গে নিজেই মতলব ভাই (আর একটু আত্মস্থ হয়। মতলবের কিন্তু ভয় কাটেনা।)
কি সুন্দর লাল টুপি পরেছো। (চমকে উঠে মতলব, দৌড়ে কাছে চলে আসে)
তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে (ছুঁয়ে দেখে কাঁপাকাপা হাতে) কি সুন্দর বিচিত্র বর্ণের সার্ট পরেছো। (ভয়ে এবার মিটকি লেগে যাবার মত অবস্থা মতলবের)

মতলব    ঃ    হায়-! হায়-!! কস ক্যামনে!!!
অন্ধ    ঃ    বৃক্ষ সবুজ, নক্ষত্র রুপালী, অন্ধকার কালো, কচুরী পানার ফুলবেগুনী- সুন্দর সাদার জন্যে মনে হয় মা মণষার মাথার মুকুট।

মতলব    ঃ    (কোন রকমে ভয়ে ভয়ে বলে) কাইলই তোরে আমি ডাক্তার দেখামু। (হাসে সুন্দর হাসি অন্ধ লোকটি)
কাট-





দৃশ্য ঃ ৯
সময় ঃ রাত
হাসপাতাল

হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে নার্সটি। ঠিক তখন মতলবের রিক্সা এসে দাঁড়ায় গেটের বাইরে। ব্যস্ততার যেন শেষ নেই তার। দ্রুত নেমে রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে দেয়। অন্ধ লোকটি তখন রিক্সায় বসে অন্ধ চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিতে থাকে। যেন চারিদিক সুগন্ধ ময়ময় করছে। দেখে রেগে যায় মতলব।

মতলব    ঃ    বাহ্-বা- দেইখা মনে হইতেছে, যেন রাজ সিংহাসনে বইসা আছোস বেটা। ওই রিক্সায় কোনদিন চড়স নাই?

অন্ধ    ঃ    পরিচিত সুখ, পরিচিত ঘ্রাণ মনে হলো তাই তো একটু যাচাই বাছাই করতে সময় লেগে গেল মতলব ভাই।

মতলব    ঃ    (মতলব নিজের মাথা দেখিয়ে বলে) এমন সব কথাবার্তা কস না। আমার এন্টিনার চাড়ে চাইর হাত উপর দিয়া যায়। ধরা ছোঁয়ার বাইরে, বুঝবো কেমনে? কি কস? নাম বেটা এইবার!

অন্ধ    ঃ    (নেমে পড়ে রিক্সা থেকে) বৃথা দৌঁড়-ঝাঁপ তোমার মতলব ভাই।
মতলব    ঃ    ক্যান, ভয় পাস নাকি?
অন্ধ    ঃ    কিসের ভয়?
মতলব    ঃ    সত্য যদি ফকফকা হইয়া যায়। ধরা খাস।
অন্ধ    ঃ    কিসে ধরা খাবো?
মতলব    ঃ    একটিং করিস না চল- হাসপাতালের ভিতরে চল। আগে ডাক্তার তো দেখাই।
অন্ধ    ঃ    চলো। (হাটা শুরু করে ঠিক তখনই পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায় নার্সটি। থেমে যায় অন্ধ)

মতলব    ঃ    কিরে- আবার ব্রেক মারলি ক্যান?
অন্ধ    ঃ    পরিচিত সুখ। পরিচিত ঘ্রাণ ধরা দেয়, ছোঁয়া যায় না। এ কিসের লুকোচুরির খেলা? একি মিথ্যে না সত্যি।

মতলব    ঃ    এই ব্যাটা চাপাবাজি কইরা ধাপ্পাবাজি করিস না, চাপাবাজির ট্রেনিংপ্রাপ্ত আমি। ধাপ্পা বাজির উস্তাদ কইলাম আমি।

অন্ধ    ঃ    চাপাবাজি না সত্যি, ধাপ্পাবাজি না, আমার মন বলছে।
মতলব    ঃ    মন কি বলছে?
অন্ধ    ঃ    বাইরে সাদা ভিতরে সাদা, কষ্ট কখনও কাদা লেপটে দিতে পারবে না। বড় শক্ত মনের মানুষ সে।

মতলব    ঃ    কার কথা কস বাতাসের মধ্যে।

অন্ধ    ঃ    ভালো মানুষের, পরিচিত মুখ পরিচিত ঘ্রাণ। আমার চেনা জানা অনেক দিনের। মনে হয় আপনজন।
মতলব    ঃ    কোথায় দেখছোস তারে?
অন্ধ    ঃ    অন্তরের অন্তস্থলে। চলতে ফিরতে মাঝে মধ্যে পাশ কেটে যায় রাস্তার মধ্যে। কি যে সুখ- কি যে আনন্দ হয় আমারÑ

মতলব    ঃ    (মনে মনে তখন মতলব বলে) “শালা কি পাগল, না ধরিবাজ! ধরতে পারতেছিনা ক্যাঁ”
খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামাশা করবি, না চোখটা পরিক্ষা করাবি?

অন্ধ    ঃ    চলো- তোমার যখন এতোই ইচ্ছা।
(চলে যায় অন্ধ লোকটি মতলবের সাথে, দূরে দেখা যায় ব্যস্ত নার্সটি।)

কাট-

দৃশ্য ঃ ১০
সময় ঃ দিন
হাসপাতাল

ডাক্তার চোখ পরিক্ষা করছে কম্পিউটারের সাহায্যে। চুপচাপ লেন্সে তাকিয়ে আছে মুখটি ঢুকিয়ে অন্ধ লোকটি। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মতলব।
কাট-

দৃশ্য ঃ ১১
সময় ঃ দিন
হাসপাতালের বাইরে।

অন্ধ লোকটাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে মতলব।

মতলব    ঃ    না রে ভাই, তোর চোখ কোনদিন আর আলোর মুখ দেখবো না।
অন্ধ    ঃ    আমি জানি তো- তারপরও ধাক্কা খেতে খেতে লটকে পটকে এতোদুর।
মতলব    ঃ    কিন্তু- -
অন্ধ    ঃ    কিন্তু? না- না কোন কিন্তু ফিন্তু নেই মতলব ভাই, সত্যি বলছি। ও নিয়ে আমার কোন মতলব নেই।

মতলব    ঃ    হই হই কান্ডো- রই রই ব্যাপার ঘটাইয়া দেওয়া যায়।
অন্ধ    ঃ    সত্যি!
মতলব    ঃ    সত্যি- সত্যি- সত্যি (হাসি ফুটে উঠে মতলবের। মতলবের মতলব বুঝার চেষ্টা করে অন্ধ লোকটি।)

কাট-

দৃশ্য ঃ ১২
সময় ঃ দিন
বটগাছ তলা

বটগাছ তলায় লোকজনের বেশ ভিড়। অন্ধ লোকটিকে ধরে এগিয়ে আসে মতলব। লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। বেখাপ্পা কোর্ট; প্যান্ট; জুতো পরে আছে অন্ধ লোকটি। খারাপ লাগছে তার ভীষন।

মতলব    ঃ    ভাইসব, পথে-ঘাটে পড়ে থাকে কত ধুলা, কত শুকনো পাতা, এর মধ্যে কোথায় পড়ে আছে মূল্যবান হীরাটি, তার খোঁজ কে রাখে? আজ যার সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দেবো। তার আছে অলৌকিক এক ক্ষমতা। সে যে কোন কিছু স্পর্শ করে রঙ বলে দিতে পারে।

লোক-১    ঃ    আরে ছো:- এ তো দ'ুবছরের শিশুও পারে।
মতলব    ঃ    তাইরে নারে না, (খুশির নাচ নাচে একপাক) আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, সে একজন অন্ধলোক। এই যে ডাক্তারী সার্টিফিকেট।

(তখন অন্ধ লোকটি স্বস্থিহীন উশখুশ করছে। পলকহীন চোখ অসীমের মধ্যে হাসছে। লোকজন কেউ উঠে এসে চোখ পরিক্ষা করছে।)

লোক-২    ঃ    (চিৎকার করে বলে) ভন্ডামী।
লোক-৩    ঃ    সব দুই নম্বারী কাম কাইজ, বুজরুকি।
লোক-১    ঃ    এই রকম কান্ড কতো দেখছি।
মতলব    ঃ    এই যে, এই যে ভাই হুটুপুটি করবেন না। সত্য-মিথ্যা যাচাই বাছাই এর জন্যে চ্যালেঞ্জ হইয়া যাক।

লোক-২    ঃ    কিসের চ্যালেঞ্জ? (উত্তেজনায় মতলব তখন কি দিয়ে কি বলবে প্রায় এলোমেলো হয়ে যায়)

মতলব    ঃ    কেও যদি ডাক্তার আইনা প্রমাণ করতে পারে সে অন্ধ না, দশ হাজার টাকা দেবো তারে, কেউ যদি না পারে-

লোক-১    ঃ    কেউ যদি না পারে?
মতলব    ঃ    (আরও উত্তেজিত এবার মতলব) কেউ যদি ফেল মারে- ফেল মারলে তার হইয়া নাকে খত দিমু একশবার-

লোক-৪    ঃ    এইডা কেমন চ্যালেঞ্জ হইলো?
মতলব    ঃ    যাতে আপনারা মনের জোরে কাজটা করেন। ডাক্তার আনার ঝক্কি আপনারা পোয়াবেন। তার খেসারত আমিই দিমু। ও হ আর একটা কাজ আপনারা করতে পারেন, কইষা তার চোখ বাইন্দা পরিক্ষা করেন।

লোক-১    ঃ    এইটা একটা যুইত সই কথা। (একদল লোক চোখ বাঁধার কাজ করে একজন লাল জামা ওয়ালা এগিয়ে আসে)

লাল জামা    ঃ    বলেন তো এইডা কি রঙ-? (ছুঁয়ে দেখে অন্ধ লোকটি)
অন্ধ    ঃ    লাল! (তাজ্জব বনে যায় সবাই। কালো চাদর গায়ে একজন এগিয়ে আসে)
কালচাদর    ঃ    বলেন আমার চাদরের রঙ কি? (ছুঁয়ে দেখে)
অন্ধ    ঃ    কালো! (মুখে তখন মতলবের বিজয়ের হাসি)

কাট-








দৃশ্য-১৩
সময় দিন

মোটামুটি অভিজাত একটি বসার ঘর। সোফায় বসে আছে অন্ধ লোকটি বিগলিতহাসি মতলবের।

মতলব    ঃ    জইমা গেছে খেলা। কইছিলাম না হই হই কান্ড রই রই ব্যাপার। টেকারে টেকা; থরে- থবিরে টেকা।

অন্ধ    ঃ    (অন্ধ লোকটি যেন ঘোরের মধ্যে থাকে) কি করে দুনিয়ার রঙ সাদা হয়? বরং ঘোর কালো-

মতলব    ঃ    ওই ব্যাটা কি কস আবার?
অন্ধ    ঃ    তাই- তো- এতো কাল দেখে এসেছি; বরং শৈশবে অনেক রং ছিল-
মতলব    ঃ    দেখ এমন প্যাঁচ-গোচের কথা কইসনা, আমি আমি হইলো সোজা মানুষ। ডাইল দিয়া ভাত খাই, সোজা পথে হাইটা যাই। তুই এমন সব কথা কস আমি টাসকা লাইগা ভিমরি খাই। কিছু বুঝিনা।

অন্ধ     ঃ    সেই যে নদীর স্রোতস্বী জল, তার ও এক ময়ুরাক্ষী রুপ ছিল। গ্রীস্মে ঝিকিমিকি, শীতে কালো বিষন্ন, সূর্য্য মামা ডুবে যেতে থাকলে- লালচে ছোপ, ছঁয়ে ছুঁয়ে কতদিন জলের রুপ পাল্টে দিয়েছি। গুঁড়িয়ে দিয়েছি। গুঁড়িয়ে দিলেই বাদামী এক রঙ ধারণ করতো- নেচে নেচে সুন্দরের খেলা চলতো। সৌন্দর্যের খেলা কাকে বলে-!

মতলব    ঃ    বেটা রংবাজ তোর কথা শুনে-
অন্ধ    ঃ    (শেষ করতে দেয় না মতলবের কথা) পৃথিবী ছিল বহুবর্ণের। তখন তো চেতনার মঞ্চে সেই পুরোনো অভ্যাসের ছিন্ন-বিছিন্ন খেলা- পুরোনো কুরশি কাটারই নানা রঙের সুতোয় বোনা নকশা। মার ওমে শুয়ে কতদিন বলেছি; মা- মাগো তোমার পরশ কী হলুদ গো মা-

মতলব    ঃ    তোর কথা শুনলে মনে হয় ভিন্ন গ্রহের মানুষ। বেটা এমনিতে চিন্তায় হুরুম হইয়া আছি।
অন্ধ    ঃ    কিশের চিন্তা?
মতলব    ঃ    খালি রঙ- রঙ দিয়া কয়দিন- মাইনষে টেকা দিব?
অন্ধ    ঃ    রঙ ছিল আমার একার আনন্দ। তুমি সেই আনন্দ জনে জনে বিলিয়ে আমাকে সত্যি সত্যি নি:স্ব করে দিয়েছো-

মতলব    ঃ    এই তো লাইনে আইছোস। তুই মানুষের হাত ছুইয়া ভাগ্য বলবি, আমি তোরে শিখামু কোন পেশার মানুষরে কি বলবি।
অন্ধ    ঃ    এই সব অশান্তির মধ্যে আমাকে আর টানা টানি করো না ভাই মতলব।
মতলব    ঃ    অশান্তি!!! (যেন আকাশ থেকে পড়ে)
অন্ধ    ঃ    হ্যাঁ অশান্তি। আমি মানুষকে রঙ এর কথা বলি। মানুষ আশ্চর্য হয়ে পয়সা দেয়।
মতলব    ঃ    বুদ্ধিডা কার? এই যে প্রচার পত্রিকা আলা তোর ছবি ছাপাইছে- কম কথা! বুদ্ধিডা কার প্লান?

অন্ধ    ঃ    মানুষ অলৌকিক ক্ষমতা দর্শন করে প্রচুর পয়সা দেয়, তুমি তো আমাকে একটি পয়সাও দেও না-।

মতলব    ঃ    এই- এই জন্যেই আল্লা তোরে আন্ধা বানাইছে। কোন কৃতজ্ঞতা নাই। ওই বেটা ওই, সারাদিন কামাই কইরা কি করতি? দুইডা ভাত ফুটাইয়া আলু ভর্তা দিয়া খাইয়া বট তলায় পইড়া থাকতি-

অন্ধ    ঃ    আমার উপার্জনের টাকা আমি পাবো না?
মতলব    ঃ    আমি না থাকলে তোর প্রতিভা কোন ব্যাডায় জানতো? কোনদিন একটা লুঙ্গি কিনা পরছোস? এই ডাট কাট, ঘর বাড়ী খানাপিনা- হু; ভালো মানুষ পাইছো তো আমারে-
(বলে চলে যায় মতলব রাগের সাথে। ঝিম মেরে বসে থাকে অন্ধ লোকটি। ধুম করে কল্পনার সেই মেয়েটি এসে হাজির হয়)

অন্ধ    ঃ    বুঝতে পেরেছি, তুমি কি জন্যে এসেছো?
মেয়ে    ঃ    কি জন্যে?
অন্ধ    ঃ    তুমি বলবে এই ঘর, লেপ তোষক, বসবার জায়গা ফ্যানের শীতল বাতাস, তা তো কখনো আমার কল্পনাও ছিল না।

মেয়ে    ঃ    সত্যি তো।
অন্ধ    ঃ    আমাকে লোভী বলবে এই তো? শোন মেয়ে টাকা জিনিসটাই বড় খচ্চর। লোভের আগুন জ্বালায় মনে, মতলব উপলক্ষ মাত্র।

মেয়ে    ঃ    অলস মস্তিস্কের লোকেরা বলতে শুরু করেছে-
অন্ধ    ঃ    রঙ বলার ক্ষমতা, অন্ধ ভিখারীর হাজার ক্ষমতার একটি। সে ধীরে ধীরে আরো আজব ক্ষমতা প্রকাশ করবে-

মেয়ে    ঃ    আরও বেশি- সে মানুষ নয়- সে অলৌকিক- প্রানী বিশেষ- (হাসতে হাসতে মিলিযে যায় মেয়েটি। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে থাকে অন্ধ লোকটি)

কাট-

দৃশ্য-১৪
সময় দিন
বটগাছ থেকে একটু দুরে

বটগাছের নিচে অন্ধ লোকটিকে ঘিরে বসে আছে মানুষজন, তার সামনে কিছু টাকা পড়ে আছে। বটগাছ থেকে একটু দুরে দাঁড়িয়ে আছে সেই নার্সটি সাদা পোষাকে। গভীর দৃষ্টিতে দেখছে সে, একটি লোক বটগাছের ওখান থেকে আসতে থাকে, তাকে জিজ্ঞাসা করে নার্সটি-।

নার্স    ঃ    ওখানে কি হচ্ছে ভাই? প্রতিদিন দেখি জমে উঠেছে মানুষজন ওই মানুষটিকে ঘিরে!
লোক    ঃ    কারে আপনি মানুষ বলতেছেন!! মানুষ না মানুষ না! মানুষের চাইতে একটু উপরে তার অবস্থান। চোখ নাই কিন্তু দিব্য চোখে সব দেখেন তিনি!

নার্স    ঃ    কি দেখে?
লোক    ঃ    আরে বললাম না সব দেখে! কিন্তু সব কিছু বলে না। খালি রঙের কথা বলে।
নার্স    ঃ    রঙের কথা বলে?
লোক    ঃ    রঙ বেরঙের দুনিয়ায় কত রঙের খেলা চলে, আমরা নাদানেশ্বর নাদান হাদারাম গাধা, তার কতটুকু দেখতে পাই - বুঝতে পাই? ওনি সব দেখেন।

নার্স    ঃ    সব দেখেন!! সব বুঝেন!!!
লোক    ঃ    কিন্তু খুব চাপা স্বভাবের। মুখে মিষ্টি হাসি, যতই কষ্টে থাকেন ওই হাসি দেখলে সব কষ্ট দূর হইয়া যাবে।

নার্স    ঃ    সব কষ্ঠ দূর হয়ে যাবে?
লোক    ঃ    যাইয়া দেখেন না বিশ্বাস না হইলে। আমার তো মনে হয় যে কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ন হইয়া যাবে কিছু বলা লাগবে না।
(চলে যায় লোকটি। অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকে নার্সটি)

কাট-

দৃশ্য-১৫
সময় ঃ দিন
বটগাছ তলা

বটগাছের নিচে রঙ এর খেলা থেমে গেছে। অন্ধ লোকটি বসে আছে। তার সামনে থরে বিথরে টাকা। একেকজন একেকভাবে বসে আছে যেন সে দরবেশ। এগিয়ে আসে মতলব, দু’জন ফিটফাট লোক সাথে নিয়ে।

মতলব    ঃ    ওই শুনছোস, ভিনদেশী এক প্রেসিডেন্ট আসতেছে। সেই প্রেসিডেন্ট আবার অন্ধ, বধির বিকালাঙ্গদের বিষয়ে দয়াবান। তিনি রাষ্ট্রকার্যের পাশাপাশি এইসব প্রতিবন্ধিদের আশ্রম পরিদর্শন করবেন।

অন্ধ    ঃ    তাই বুঝি?
মতলব    ঃ    তুই যদি টাসকা লাগাইতে পারোস তয়লে কিন্তু রাজা। এই যে ওনারা সব ব্যবস্থা কইরা দিবো। হ। বল দেখি ওনার টাইয়ের রং কি?

অন্ধ    ঃ    নীলাভ-।
ফিটফাট-১    ঃ    এতো সত্যি টাসকা লাগার মত অবস্থা-।
ফিটফাট-২    ঃ    কিন্তু ওর ওই টসটসে চোখ দেখে যদি বিশ্বাস না করে?
ফিটফাট-১    ঃ    আচ্ছা। তুমি কি সত্যি চোখে দেখো না?
অন্ধ    ঃ    না-
ফিটফাট-১    ঃ    তা হলে তোমার ওই চোখের উপস্থিতি থাকলে কি আর না থাকলেই কি? সত্যি কিনা? (কোন কথা বলে না অন্ধ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে)

মতলব    ঃ    ওর চোখ দুটো উপড়ে ফেলে উপস্থাপন করবো মাননীয় অতিথির সামনে-
ফিটফাট-২        তাহলে তো সব দু:চিন্তা গেল। (অন্ধ লোকটি চিৎকার করে বলে)
অন্ধ    ঃ    না- (না ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে)

কাট-




দৃশ্য-১৬
সময় ঃ দিন
হাসপাতাল
হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে অন্ধ লোকটি। হঠাৎ উঠে বসে, চিন্তায় পরিচিত সেই হাসিটি উধাও।

অন্ধ    ঃ    দূঃসময় আমাকে ঘিরে ধরেছে চারিদিক থেকে। এতো একা লাগছে, একা। কি নিদারুন একা আমি! আমি কে? কে আসলে আমি? কোথায় ছিলাম আমি? এখন কোথায় আমি? কি দরকার আমার এই পৃথিবীতে? আমার কল্পনার সেই মেয়েটিও আমাকে ফাঁকি দিয়েছে! কোথায় তুমি?
(চুপচাপ থাকে যেন মেয়েটির সাড়া শব্দ পেতে চেষ্টা করছে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে থাকে।)
আগে খুব ভালো ছিলো, মায়ের রঙ কালো ছিলো,
চাঁদের রঙ হলুদ ছিলো, ভাতের রঙ সাদা ছিলো,
রাত যায় দিন যায়, নাগরিক আকাশ ছিড়ে পাখি চলে যায়। সবাই চলে যায়- (একটু থামে)
আমি কোথায় যাবো? হেই মেয়ে শুনছো- আমার আর একা ভালো লাগছে না।
(হঠাৎ মেয়েটি বসে বিছানায়।)

মেয়ে    ঃ    আমাকে এভাবে পাগলের মতো ডাকছো কেন?
অন্ধ    ঃ    আমি মনে হয় পাগলই হয়ে যাবো।
মেয়ে    ঃ    কেন?
অন্ধ    ঃ    ওরা আমাকে ঔষধ দিয়েছে। শুধু ঘুম আর ঘুম। ঘুম আমাকে পেয়ে বসেছে।
মেয়ে    ঃ    ভালো তো-।
অন্ধ    ঃ    না-না ভালো না। আমি আমার দিন রাত সব হারিয়ে ফেলেছি।
মেয়ে    ঃ    তুমি এতো রঙ ধরতে পারো। আর বর্তমান পৃথিবীর রঙটা ধরতে পারছো না?
অন্ধ    ঃ    পারছি না তো। গাঁদা ফুলের বাগানে বড় বড় ফুলগুলো ফুটে আছে থরে বিথরে। দেখেছো কখনো?

মেয়ে    ঃ    দেখেছি, কি সুন্দর বাতাস পেলে হেলে দুলে নাচে পাল্লা দিয়ে।
অন্ধ    ঃ    হলুদ-হলুদ হলুদের মাখামাখি যেন, সেই হলুদ আমার সাথে দূষ্টমী মার্কা অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ছে বার বার। সব সব হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু জোনাকি পোকা জ্বলছে আমার মনের মধ্যে। ভালো করে আলো ধরতে গেলে, ভালো করে ধরতে গেলে সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। দিনের ভালো রাতে কালো সব এক হয়ে যাচ্ছে।
(হঠাৎ মেয়েটি হেসে উঠে।)

অন্ধ    ঃ    হাসছো কেন?
মেয়ে    ঃ    তুমি কি হঠাৎ লোভে পড়েছিলে?

অন্ধ    ঃ    হঠাৎ না- ধীরে ধীরে। মতলবের হাজারও মতলব বাজি তারপরও - লোভে আমাকে পেয়ে বসলো। জানো সেই লোভটা থেকে মুক্ত হতে পারছি না।

মেয়ে    ঃ    এই জন্য পালিয়ে যেতেও পারছো না।
(ধাম করে মেয়েটি মিলিয়ে যায়।)

অন্ধ    ঃ    তুমি পালিয়ে যেয়ো না, না- না যেও না, যেও না
(হঠাৎ করে আবার একটা সুখের নিঃশ্বাস নেয় বড় করে)

দৃশ্য-১৭
সময় ঃ দিন
বারান্দা ও কেবিন

বারান্দা দিয়ে হেটে এসে অন্ধ লোকটির কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ায় নার্সটি। দেখতে থাকে অন্ধ লোকটিকে। অন্ধ তখন যেন বাতাসে সুখ ধরছে ঘ্রান নিয়ে নিয়ে।

অন্ধ    ঃ    আমি কি লোভের সাগরে ডুবে সাঁতার খেলছি। না সুখের সমুদ্রে ভাসছি। বুঝতে পারছি না কেন?

নার্স    ঃ    (কেবিনে প্রবেশ করে নার্স) আপনি  এতো রঙ ধরেন আর নিজের মনের রঙ ধরতে পারেন না?

অন্ধ    ঃ    পারি না তো।
নার্স    ঃ    অথচ দুষ্ট লোকেরা ঠাট্টা মস্করা করে বলে আপনি রংবাজ। জায়গা মতো ঘাই গুতো খেলে সব রঙ ছুটে যাবে রঙের রাজার।

অন্ধ    ঃ    ওরাই হয়তো ঠিক বলে। নিঃস্ব আমি। কিছু নেই আমার। তবু কিছু কিছু সুখ ছিল। সুখের খেলা ছিল আমার।

নার্স    ঃ    সুখের খেলা!
অন্ধ    ঃ    রঙের খেলা। যা ছিল আমার একার আনন্দ, একার সুখ কি যে মজা। মতলবের মতলব বাজিতে আর সামান্য একটা লোভে জনে জনে বিলিয়ে দিয়ে আজ আমি হেলা ফেলা সবার কাছে।

নার্স    ঃ    আর কোথায়? কোথায় সুখ আপনার?
অন্ধ    ঃ    সাদা পোষাকের বড় মনের মানুষ তুমি, তুমিও হয়তো জানোনা তোমাকে নিয়েও সুখের খেলা ছিল আমার মনের গভীরে। কত খেলা খেলেছি মনে মনে।

নার্স    ঃ    (আশ্চর্য হয়ে যায় নার্স, তাকিয়ে থাকে) আ-মা-কে নিয়ে আপনার সুখের খেলা!
অন্ধ    ঃ    প্রতিদিন সকালে আমার যাওয়ার পথে আর আপনার আসা-যাওয়া পথে সাদা পোষাকের ভালো মনের মানুষটির জন্যে আমার আকুল ব্যাকুল প্রার্থনা। দেখা হলেও - না হলেও।

নার্স    ঃ    আমার জন্যে আপনার প্রার্থনা!
অন্ধ    ঃ    হ্যাঁ। সেটাও তো আমার সুখের খেলা।
নার্স    ঃ    কি প্রার্থনা করতেন আমার জন্যে!!!
অন্ধ    ঃ    কতশত রকমের প্রার্থনা। ঈশ্বর যদি আমার কথা একদিন শুনে থাকে তাহলে কোন কষ্ট আপনাকে টলাতে পারবে না।

নার্স    ঃ    আমি যে আপনার পাশ দিয়ে যাতায়াত করতাম, আপনি বুঝতেন কি করে? আপনি তো চোখে দেখেন না। ডাক্তাররা বলাবলি করছিল দেখার সম্ভাবনাও নেই কোনদিন।

অন্ধ    ঃ    আমি আমার সুখ দিয়ে, মজা দিয়ে, আনন্দ দিয়ে ঠিক ঠিক বুঝতে পারতাম। এই ফিরে তাকালো সাদা পোষাকের মানুষটি। আমি থেমে গেছি সম্মানে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।

নার্স    ঃ    আমাকে সম্মান শ্রদ্ধায় ভালবাসায়!!!
অন্ধ    ঃ    তোমার ওই সাদা পোষাকের চাইতেও সাদা তোমার ভিতরটা। আমার তাই মনে হয়।
নার্স    ঃ    আর কি মনে হয় আমাকে নিয়ে?
অন্ধ    ঃ    তোমার মত সাদা মনের মানুষ একটিও নেই এই শহরে। সেজন্যই তো আমার প্রতিদিনের প্রার্থনা তোমার জন্যে-

(কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যায় নার্সটি। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। অন্ধের মুখে সেই মিষ্টি হাসি।)

কাট-
  
সময় ঃ দিন
দৃশ্য-১৮
হাসপাতালের বহিরাঙ্গন

(কথা বলছে ফিটফাট লোক দু’জনের সাথে মতলব)

ফিটফাট ১    ঃ    কি বলে রঙের রাজা?
মতলব    ঃ    রাজি হয় না কিছুতেই। আমারও কেমন একটা মায়া পইড়া গেছে ছেমড়ার জন্যে। জোর জবরদস্তি তো করতে পারতেছিনা।

ফিটফাট    ঃ    জোর জবরদস্তির কইরা চোখ উপড়ায় ফেলতে পারবেন না। দেশে আইন কানুুন আছে।
ফিটফাট ১      ঃ    লোভ দেখান সুখ-শান্তি-নিরাপত্তার। ভালো কইরা বুঝান- ভোগ বিলাসের দরকার আছে জীবনে।

মতলব    ঃ    দেখি কি করা যায়।
ফিটফাট    ঃ    সময় কিন্তু হাতে খুব কম।
মতলব    ঃ    যাই দেখি।
(চলে যায় মতলব ফিটফাট দু’জনের হিসাব মিলে না, চোখে মুখে তার ছাপ)

কাট-

দৃশ্য-১৯
সময় ঃ দিন
স্থানঃ কেবিন

(বেডে ঘুমিয়ে আছে অন্ধ লোকটি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে নার্স গভীর ভাবে দেখছে নার্স।)

নার্স    ঃ    আমি যদি পারতাম পৃথিবীর সমস্ত রঙ রুপ আমার চোখ দিয়ে তোমাকে দেখাতাম হে রঙের রাজা।
(পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে, মনে মনে স্বপ্ন বুনে চলে। দৃষ্টি যায় সুদূরে)
মিক্স টু








স্বপ্নের দৃশ্য-২০
সময় ঃ দিন
বাগান

একটি বাগানে হাটছে অন্ধ লোকটি আর নার্স

অন্ধ    ঃ    কি বাহারের ফুল গো সাদা মনের মানুষ চারিদিকে!
নার্স    ঃ    আহ্ কি আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে। আমার চোখের ঝিলিক দিয়ে তুমি দেখছো আমাকে। আমার চার পাশের সৌন্দর্যকে।

অন্ধ    ঃ    এই আলোর ঝিলিক দ্রুত অতিদ্রুত নিভে যাবে।
নার্স    ঃ    যাক তবুও তুমি দেখছো এই আমার সুখ।
অন্ধ    ঃ    তুমি তোমার একটি চোখের আলো নিভিয়ে দিয়ে কেন পাগলামী করতে গেলে?
নার্স    ঃ    আমার সুখের জন্যে। যদি পারতাম আমার দুই চোখের আলো দিয়ে তোমার চোখ আলোকিত করে রাখতাম। আমি নিজে আলোকিত হতাম। পুলকিত হতাম।

অন্ধ    ঃ    পাগল তোমার সংসার আছে স্বামী আছে।
নার্স    ঃ    আমার সমস্ত কষ্ট তো সেখানেই।
অন্ধ    ঃ    কষ্ট?
নার্স    ঃ    স্বামী আছে সংসার আছে। তবু কিছু নেই। নেশা ছাড়া মানুষটা কিছু বুঝে না। আমার সামনে ঘুরে বেড়ায়, চরে বেড়ায়। স্বপ্নহীন বাস্তবহীন একটি মৃত মানুষ মনে হয়। সেই জন্য তো সাদা শাড়ীতে বিধবার বেশে আনন্দেই থাকি-।


ফেড আউট

দৃশ্য-২১
সময় ঃ দিন
কেবিন

(চোখটা ঝাপসা হয়ে যায় নার্সের। টপ করে গড়িয়ে পড়ে অশ্র“দানা। চোখটা মুছে ভালো করে উঠে দাঁড়াতেই কথা বলে উঠে অন্ধ)

অন্ধ    ঃ    (উঠে বসে অন্ধ) চলে যাচ্ছেন?
নার্স    ঃ    হ্যাঁ ডিউটি বলে কথা। শুধু আপনার কথা ভাবলে চলবে?
অন্ধ    ঃ    কি সৌভাগ্য- আপনি বুঝি আমার কথা ভাবছিলেন?
নার্স    ঃ    হ্যাঁ।
অন্ধ    ঃ    কি ভাবছিলেন?
নার্স    ঃ    ডাক্তাররা বলেছে আপনার চোখের কর্নিয়া নতুন করে প্রতিস্থাপন করলেও বেশিদিন সে চোখে আলো ধরে রাখতে পারবেন না।

অন্ধ    ঃ    না। আমি সেটা জানতে চাইনি। জানতে চেয়ে ছিলাম, আমাকে নিয়ে কি ভাবা হচ্ছিল।
নার্স    ঃ    কেউ যদি তার চোখের কর্নিয়াটা আপনাকে দান করতো।
অন্ধ    ঃ    কি হতো? আবার তো সেই অন্ধকার নেমে আসতো।
নার্স    ঃ    (চলে যেতে থাকে নার্স) কিছুদিনের জন্য আমাদের সুখ দুঃখের চেহারাটা দেখতে পেতেন।

অন্ধ    ঃ    সে আমি এখনই বুঝতে পারি। এই যে কি সুন্দর বড় করে নীল টিপ পরেছেন। সাদার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে। যেন নীল পদ্ম ফুটে উঠেছে আপনার কপালে।

নার্স    ঃ    কিভাবে বুঝতে পারেন?
অন্ধ    ঃ    ভালোবাসা দিয়ে বুঝতে পারি।
নার্স    ঃ    ভালোবাসা দিয়ে সব বুঝতে পারেন?
অন্ধ    ঃ    হ্যাঁ। ভালোবাসা দিয়ে সব বুঝতে পারি। আমার বিশ্বাস ভালোবাসা দিয়ে সব বুঝা যায়।
নাস    ঃ    (বলতে বলতে চলে যায়) ওই ভালোবাসা আর বিশ্বাসটা আমাদের বড় অভাব গো বড় অভাব। সেই জন্যই এতো কষ্ট।

 (অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে অন্ধ)
কাট-
   
দৃশ্য-২২
সময় ঃ দিন
হাসপাতালের বহিরাঙ্গন

(চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মতলব। চোখে মুখে রাজ্যের দুঃখ যেন বাসা বেঁধেছে। এগিয়ে আসে ফিটফাট বাবু দু’জন।)

ফিটফাট ১      ঃ    কষ্ট যেন তোমার চোখে মুখে বাসা বাঁধছে মতলব মিয়া?
ফিটফাট    ঃ    মায়া মমতা সুড়সুড়ি দিচ্ছে না কি অন্তরের মধ্যে?
মতলব    ঃ    কষ্ট। কষ্ট হচ্ছেরে ভাই। মায়া মমতা কিনা জানি না। মায়া মমতার ধারের কাছে ছিলাম না কোনদিন। তারপরে এতো কষ্ট লাগতাছে ক্যান?

ফিটফাট ১      ঃ    কিশের এতো কষ্ট তোমার মতলব মিয়া?
মতলব    ঃ    ছেলেটার জন্য কষ্ট, ছেলেটার চোখের জন্য কষ্ট, আহ্-হা রে, কি সুন্দর চোখ জোড়া, মনে হইতেছে চোখ জোড়া সব সময় হাসতো, খেলতো, তামাশা করতো, টিটকারি মারতো। আর তো ওই চোখ জোড়া হাসবো না খেলবো না। ঠাট্টা মস্করা করবো না।

ফিটফাট    ঃ    মতলব মিয়া কবি হয়ে গেলে নাকি!
মতলব    ঃ    কবি হইলে তো বাঁইচা যাইতাম। অন্যায় অন্যায় ঠেকতাছে। কত রাগ দেখছি ওই চোখে- সেই রাগের মধ্যে মায়া মমতার খেলা দেখছি।

ফিটফাট    ঃ    ভুইলা যাও মতলব মিয়া।
মতলব    ঃ    ভুলতে পারতেছিনা রে ভাই। চোখ দুইডা শাষাইয়া বেড়াইতেছে। বড় ভয়ে ভয়ে আছে।
(চলে যায় মতলব, অবাক হয়ে দেখে ফিটফাট বাবু দু’জন) 

দৃশ্য-২৩
সময় ঃ দিন
হাসপাতালের একটি খাটিয়া

(যেন প্রত্যাশা আর কল্পনার সেই মেয়েটির হাসির হুল্লোড় বইছে। একাকি বসে আছে অন্ধ, চোখে ব্যান্ডেজ।)

অন্ধ    ঃ    (মনে মনে বলে) “প্রত্যাশা- প্রত্যাশা, কষ্ট- শুধু কষ্ট- তুমি তো আমাকে শিখিয়েছিলে কালোও ভালো, ভালোও ভালো। কালো আর ভালো লাগছে না আমার। আমার কল্পনার সেই মেয়েটি কই? ‘উপমা’? হ্যাঁ উপমাই তো! কেউ নেই- কোথাও নেই? (আবার হাসির শব্দ)
(উচ্চস্বরে) শোন তোমরা, আমার রঙ খুঁজে পাচ্ছিনা। শুধু অন্ধকার। যেখানে জড় দুটো টসটসে চোখ ছিল সেখানে বিকট ক্ষীন শীত আর যন্ত্রনার গনগনে লোহা দোজখের শাস্তিতে খেলা করছে। পৈশাচিক উল্লাসে সেখানে শুধু রক্তের হুল্লোড়, শুনতে পাচ্ছো তোমরা?

কাট-

দৃশ্য- ২৪
সময় দিন
বারান্দা
(বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নার্স চোখে অশ্র“র বন্যা।)

কাট-
   
দৃশ্য- ২৫
সময় দিন
ড্রইং রুম

(বসে আছে অন্ধ লোকটি নির্বিকার। চোখে কালো চশমা। মতলবও অধির আগ্রহে বসে আছে।)

ফিটফাট-১    ঃ    সব আয়োজন শেষ এখন শুধু অপেক্ষা।
ফিটফাট-২    ঃ    আগামীকাল বিকাল পাঁচটায় ভিনদেশী প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ।
ফিটফাট-১    ঃ    প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি আসবেন। তিনি আগে পরীক্ষা নিরিক্ষা করবেন। তারপর- (দু’তিনজন পুলিশসহ আরও কিছু মানুষ আসে, প্রতিনিধি ক্রিম কালারের স্যুট পরিহিত) এই যে আইসা পড়ছে।

প্রতিনিধি    ঃ    এই সে আশ্চর্য মানুষ?
মতলব    ঃ    জে: স্যার?
প্রতিনিধি    ঃ    বলতো আমি কোন কালারের পোষাক পরিহিত? (অন্ধ কথা বলে না। গম্ভীর হয়ে বসে থাকে)

প্রতিনিধি    ঃ    আশ্চর্য! ও তো কথা বলছে না।
মতলব    ঃ    একটু কাছে যান ছুইয়া দেখুক।
(কাছে যায় প্রতিনিধি। গভীর মমতায় হাত বুলায় অন্ধ লোকটি)
প্রতিনিধি    ঃ    বল- বল দেখি।
অন্ধ    ঃ    (অন্ধ লোকটির বুক চিরে যেন কষ্টের দলা বেরিয়ে আসে। কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলে) লাল! রক্তের মত লাল! টকটকে লাল!

ফ্রিজ

1 মন্তব্য(গুলি):

Unknown বলেছেন...

নাটক হয়েছিল গল্পটি নিয়ে। যতদূর মনে করতে পারি, চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করেছিলেন সেটিতে। কোনোভাবে নাটকটির পরিচাকের সাথে যোগাযোগের উপায় কি বলতে পারেন?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ruby